ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে বিরোধীদের নির্বাচন কমিশন অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল থেকে কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র ও শিবসেনার (ইউবিটি) সঞ্জয় রাউতসহ একাধিক সাংসদকে আটক করেছে পুলিশ।
ক্ষমতাসীন বিজেপির সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ‘আঁতাতের’ অভিযোগ তুলে সোমবার এ বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল তারা এনডিটিভি জানিয়েছে, সাংসদরা পার্লামেন্ট ভবন থেকে নির্বাচন কমিশন কার্যালয় যাওয়ার পথে প্রথমেই পুলিশের ব্যারিকেডের মুখে পড়েন। তখন সেখানে বসেই স্লোগান দেওয়া শুরু করেন তারা।
কয়েকজন ব্যারিকেড টপকানোর চেষ্টা করলে পুলিশ এমপিদের আটক করা শুরু করে। আটক এমপিদের মধ্যে তৃণমূলের মহুয়া মৈত্র, মিতালি বাগও রয়েছেন বলে জানিয়েছে আনন্দবাজার।
রাহুল ও অন্য সাংসদদের বাসে করে থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের কংগ্রেসের এ নেতা বলেন, “এই লড়াই রাজনৈতিক নয়, এটি সংবিধান বাঁচানোর লড়াই। লড়াই ‘এক ব্যক্তির এক ভোটের’ জন্য।”
দিল্লি পুলিশের যুগ্ম কমিশনার দীপক পুরোহিত সাংসদদের আটক করার কথা নিশ্চিত করলেও কতজনকে আটক করা হয়েছে তা বলতে পারেননি।
“ইনডিয়া জোটের আটক নেতাদের কাছাকাছি থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে,” বলেছেন তিনি।
পুলিশের এ কর্মকর্তা জানান, এত বড় মিছিল করার অনুমতি নেননি বিরোধী সাংসদরা। ৩০ জন পর্যন্ত সাংসদকে মিছিল নিয়ে নির্বাচন কমিশনে যেতে ও অভিযোগ জমা দিতে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
“নির্বাচন কমিশন বলেছিল ৩০ জন সাংসদ তাদের সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারে। কিন্তু ২০০ জনের বেশি মিছিল নিয়ে আসছিলেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির শঙ্কায় আমরা তাদের থামাই। তারপর আটক করি। কয়েকজন এমপি ব্যারিকেডের ওপর দিয়ে লাফিয়ে যেতে চেষ্টা করেছিলেন। তাদেরও আটক করা হয়েছে,” বলেছেন আরেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার দেবেশ কুমার মহলা।
ভারতের পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে বিক্ষোভস্থলের একাধিক ভিডিও ফুটেজে কয়েক ডজন রাজনীতিক ও তাদের দলীয় কর্মীদের স্লোগান দিতে দিতে ব্যারিকেডের ওপর পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করতে দেখা গেছে। এসময় বিরোধীদের অনেকের হাতেই ছিল নানান দাবি দাওয়ার প্ল্যাকার্ড।
আরেকটি ভিডিওতে সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবকে দুটি পুলিশ ব্যারিকেডের ওপর উঠে যেতে দেখা যায়।
আনন্দবাজার লিখেছে, পুলিশ আটক করে বাসে তোলার সময় ধস্তাধস্তিতে অসুস্থ হয়ে পড়েন মহুয়া মৈত্র, মিতালি বাগ। অসুস্থ হয়ে পড়েন সমাজবাদী পার্টির এক সাংসদও। তাদের অসুস্থতার খবর পেয়ে দ্রুত ছুটে আসেন রাহুল গান্ধী। তিনি পরে বাস থেকে নেমে সমাজবাদী পার্টির অসুস্থ সাংসদকে অন্য গাড়িতে তুলেও দেন।
ইনডিয়া জোটের সাংসদদের বিক্ষোভ ঘিরে আগে থেকেই পার্লামেন্ট ভবনের চারপাশের সড়কে ব্যারিকেড বসিয়েছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মোতায়েন করা হয়েছিল বিপুল সংখ্যক পুলিশ।নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার জালিয়াতির অভিযোগ আনা বিরোধীরা বলছে, গত বছর মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে বলে তাদের সন্দেহ।
ওই নির্বাচন হয় লোকসভা নির্বাচনের ছয় মাস পর। লোকসভা নির্বাচনে সেখানকার আসনগুলোতে বিজেপি বিরোধীরা বেশি আসন জিতলেও, বিধানসভায় তাদের ভরাডুবি দেখা যায়।ইনডিয়া জোট বলছে, বিজেপিকে জেতানোর জন্য নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকায় কারচুপি করেছে।
তাদের ভাষ্য, লোকসভার পর বিধানসভা নির্বাচনের আগে তালিকায় ‘অস্বাভাবিক সংখ্যার’ নতুন ভোটারকে যুক্ত করা হয়েছে। এটাই ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে কমিশনের আঁতাত নিয়ে সন্দেহ বাড়িয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ আছে কর্ণাটকে লোকসভা নির্বাচন ঘিরেও।বিহারে বিধানসভা ভোটের কয়েক মাস আগে নির্বাচন কমিশন যে ভোটার তালিকা ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধনের’ নির্দেশ দিয়েছে তা নিয়েও আপত্তি তুলেছে বিরোধীরা।
ভোটার তালিকার সংশোধনের এ আদেশ সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জও করা হয়।
আবেদনকারীরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের এ ধরনের আদেশ দেওয়ার এখতিয়ারই নেই। এমন সময়ে এ ধরনের আদেশ নিয়ে প্রশ্নও তুলেছে তারা। বলছে, সংশোধিত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ারা এত অল্প সময়ে আপিল করে ভোটাধিকার ফেরত পাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন এ আদেশ দিয়েছে সেসব ভোটারদের ছেঁটে ফেলতে, যারা মূলত কংগ্রেস ও অন্যান্য বিজেপি বিরোধীদেরই ভোট দিয়ে আসছিলেন।
এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় আধার কার্ড বা ভোটার আইডি দেখালেও কাজ হবে না বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। তারা জন্মসনদসহ আরও কিছু কাগজ চেয়েছে। এসব নিয়েও বিরোধীদের প্রশ্ন আছে।আদালত নির্বাচন কমিশনকে তার সংশোধন প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে বললেও প্রকৃত ভোটাররা যেন কোনোমতেই বাদ না পড়ে তা দেখতে, এবং বাদ পড়ারা যেন আপিলের পর্যাপ্ত সুযোগ পায় তা নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দিয়েছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশন বিরোধীদের সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের সব কাজই স্বচ্ছ এবং তাদের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। তারা রাহুল গান্ধীর কাছে লিখিত অভিযোগ ও তার সপক্ষে প্রমাণও চেয়েছে।বিজেপি বলছে, রাহুল ও অন্য বিরোধী নেতারা একটি ‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করছেন’।
“রাহুল গান্ধীর যদি সত্যিই নিজের ওপর আস্থা থাকে তাহলে তিনি সেই অবৈধ ভোটারদের নাম দিতে পারেন, যাদের নাম তালিকায় আছে বলে তার দাবি। তা না করতে পারলে এটা স্পষ্ট হবে যে তার কাছে আসলে কিছুই নেই, এবং তিনি যা করছেন, সেটা হল রাজনৈতিক নাটক,” এক্সে দেওয়া পোস্টে এমনটাই বলেছেন বিজেপির অমিত মালব্য।